Notice :
Welcome To Our Website...
স্মৃতিময় দিনগুলি… অধ্যাপক মিজানুর রহমান মিয়া

স্মৃতিময় দিনগুলি… অধ্যাপক মিজানুর রহমান মিয়া

প্রথম পর্ব

একজন সমাজ চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে ব্শ্বিজুড়ে সামাজিক পরিবর্তন ,সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে উত্তরনের দিক নির্দেশনা, দর্শন নিয়ে লেখার জন্য আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস । আমার সাবেক ছাত্র দূরবীন অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও প্রকাশক মোশাররফ হোসেন এর অনুরোধে আমার জীবন পরিক্রমার আলোকে, কয়েকটি পর্বে স্মৃতিময় দিনগুলি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি ।

এতে সমকালীন ঘটনাবলী ,আমার বেড়ে ওঠা ,হাতেখড়ি, শিক্ষাজীবন,রাজনীতি , খেলা ,সংস্কৃতি, বাংলাদেশে ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষকতা ,গবেষনাকর্ম ,সমাজকর্ম ও পুরস্কার অর্জন , প্রকাশণা ,সমাজসেবা সবই স্থান পাবে ।সর্বোপরি সাউদার্ণ ইলিনয় ইউনিভার্সিটি কার্বোন্ডেল এর সমাজকর্ম বিভাগে গ্রাজুয়েট প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে ২০ বছর দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের ছাত্র,শিক্ষক,গবেষকদের বিভিন্নভাবে পড়াশোনার সুযোগ করে দেবার বিষয়গুলো আলোকপাত করবো । এটা আমাকে দেশপ্রেমবোধ থেকে উৎসাহ যুগিয়েছে ।

সম্মানিত পাঠক প্রায় ৭০বছরের স্মৃতিময় দিন ̧লিতে আজ অনেক স্মৃতি হারিয়ে গেছে ।অনেক সহপাঠি, রাজনৈতিক দর্শণ আর নেই ।হারিয়েছি আমার পিতামাতা ,আত্মীয় স্বজন ,মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানি । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে । সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাাই ।

কালকিনির রমজানপুরে বেড়ে ওঠা

মাদারিপুর জেলার কালকিনি নদীবেষ্টিত এলাকা । আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে অবিস্থিত ।মাটি ও মানুষের স্বয়ংসমপূর্ণ পল্লী সমাজ ।এটা ছিল তখনকার বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুরের জীবনচিত্র ।আবহমান বাংলার চিত্র । মুসলিম ,হিন্দু বৌদ্ধ ,খৃস্টিয়ান ঈদ,পূজা বড়দিন ,মাঘি পূর্নিমায় একযোগে উৎসবে মেতে উঠত ।দলবেধে দেখতো নাটক

যাত্রা পালা ,বাউল ,কীর্তণ উৎসব । অসামপ্রদায়িক চেতনার ঐতিহ্যবাহী জীবন । আজও এ চেতনার বীজ আমার হৃদয়ে চির জাগরূক ।এটাই আমাকে পরবর্তীতে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করেছিল । দেশের টানে বড় হয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। দীর্ঘকাল দেশে বিদেশে শিক্ষকতা করলেও এটাই আমার জীবনের সেরা অর্জন ।আজকের প্রজন্মকে আমাদের দেশপ্রেম ও অসাম্পধদায়িক চেতনার ঐতিহ্যকে লালন করে লালসবুজ পতাকা হাতে দেশের উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান করছি ।মনে রাখতে হবে ‘মানুষ মানুষের জন্য।

ফিরে আসি আমার বেড়ে ওঠার সময়কালে । আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহি পরিবেশে রমজানপুরের মুনশিবাড়িতে আমার জন্ম ।১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বাবা ইউনিয়নের ভিপি আবদুর কাদের মিয়ার সাত সন্তানের মধ্যে আমি পনচম ।বড়ভাই ডা: আবুল কাশেম , অলিউল হাসনাত , মনজুরুল কাদের, জাহানারা হোসেন ,মরিয়ম আলম,ছোটভাই রিয়াজ কাদের , ছোট বোন শান্তা কাদের ও মা মিলে আমাদের পরিবার।

আরও পড়ুনঃ

বহুদিন পর টেস্টে মেজাজে ব্যাটিং বাংলাদেশ দলের

১৯৪৮ সালে আমাদের বাড়ির জমির উপর উত্তর রমজানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার শিশুপাঠ শুরু । তালপাতা ও দোয়াতে কয়লার কালি,বাঁশের কনচির তৈরি কলম দিয়ে অ আ ক খ লিখা শিখিয়েছিলেন আমার স্কুল শিক্ষক । তবে ইংরেজি এ বি সি ডি বাদ যায়নি ।

বরিশাল জিলা স্কুল,বিএম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাউদার্ণ ইলিনয়

এরপর ১৯৫২ সালে ৭ম শ্রেণীতে বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ।এখান থেকে এসএসসি পাশ করি ১৯৫৬ সালে।১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের মিছিলে ঢাকায় গুলি হলে বরিশালে এর প্রতিক্রিয়ায় শোভাযাত্রা বের হয় ।এতে সামনে থেকে শহীদ আলতাফ মাহমুদ, লকিতুল্লাহ, হাবিবুল্লাহ একুশের গান গাইতেন । আর মিছিলে নেতৃত্ব দিতেন ন্যাপ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ,এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনসহ বিভিন্ন রাজননৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ। আমার স্কুল সহপাঠি আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু , বারেক,মুনিবুর রহমান,নুরুল ইসলাম মনজুর, জেনারেল সাদেকসহ আমরাও একুশের মিছিলে যোগ দিয়েছি সেসময়।বরিশালে তখন ভাষা আন্দোলনের জন্য কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে
অন্যান্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছিল । এরপর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনেও বরিশাল ছিল উত্তাল । যোগাযোগের জন্য তিন পয়সার পোস্ট কার্ড তখন জনপ্রিয় ছিল ।

১৯৫৭ – ৫৮ সালে বরিশাল বি এম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি ।এখান থেকে আমার জীবন চলার পথে নিত্য সঙ্গী ছিল পড়া, খেলা ,নাটক ও রাজনীতি ।

১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়ে তৎকালীন ঢাকা হলে বসবাস শুরু করেছিলাম । এখানে এনায়েত উল্লাহ খান ভিপি, শওগাত উল আলম সগির ছিলেন ক্রীড়া  সম্পাদক । আমি সহকারি ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি । ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দেশজুড়ে সামরিক আইন ঘোষনা করে সংসদ ভেঙ্গে দেন । এর প্রতিবাদে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে এসেছিল । ঢাকা তখন উত্তাল । মিছিলের নগরিতে পরিনত হয় । আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে তাতে যোগ দিয়েছিলাম ।

পরবর্তীতে মনজুর কাদের কমিশন কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সে প্রতিবছর পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় । ১৯৬০ সালকে নন একাডেমিক বছর গণ্য করা হয় ।রাজনীতি ও খেলা, নাটক সব মিলে আমার পড়াশোনা ঠিকমত হয়নি । তাই সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা বাদ দিতে হয়েছিল ।এমতাবস্থায় আমি বাবাকে না জানিয়ে চাঁদপুর গিয়ে নাটক ও খেলা শুরু করি । তখন সেখানে এসডিও ছিলেন নুরুল কাদের খান । চাঁদপুর সার্কেল ক্লাবে ক্রিকেট খেলতাম । খবর পেয়ে বরিশালের গইলা থেকে আমার আত্বীয় মোজাম্মেল তালুকদার চাঁদপুর আসেন ।তিনি কাপড়ের টেইলার্স ব্যবসা করতেন বরিশালের টরকি বন্দরে । অবশেষে আমি বাড়িতে ফিরে যাই । নয়মাস পর ১৯৬১ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সমাজতত্ব বিভাগে পুন:ভর্তির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে বিখ্যাত অধ্যাপক নাজমুল করিম রাজি হলেন না । নতুন আইনে প্রথম বর্ষে নতুনভাবে ভর্তি হতে বললেন । অগত্যা আবার প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে গেলাম । এবার প্রথম বর্ষে আমার সহপাঠি মাহবুব জামিল ,খালেদ ইউসুফ ,আহমেদ জামান চৌধুরি, মাহমুদ হাসান,তৌফিক ইলাহি , নাকিব মোস্তাফা ,আহমেদ ফজলে হাসান, নীলুফার কায়সার ।নিজেকে ̧ছিয়ে নিয়ে ১৯৬৪ সালে অনার্স পরীক্ষায় প্রথমস্থান অর্জনে সক্ষম হয়েছিলাম । ​১৯৬৫ সালে রাজনীতি আর খেলা মিলে চাপে থাকায় মাস্টার্সে ৫ম হয়েছিলাম ।পরে আমেরিকা এসে সমাজতত্বে পিএইডি , জন স্বাস্থ্য ও সমাজকর্মে মাস্টার্স সমাপ্ত করি ।

১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জন্যস্বাস্থ্যে মাস্টার্স, ১৯৮৫ সালে সাউদার্ণ ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্বে পিএইচডি,১৯৯৮ সালে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে মাস্টার্স করেছি ।

সর্বোপরি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যোলয়ের সমাজতত্ব বিভাগ,আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ভালদস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সৌভাগ্য হয়েছে । এনসাইক্লোপেডিয়া অব স্যোসিয়াল ওয়ার্ক ১৯ ও ২০তম অংশের অধ্যাপনা, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানিত অধ্যাপক হিসেবে মস্কো স্টেট একাডেমি টেকনোলজি এন্ড হিউম্যান সার্ভিস পুরস্কার অর্জন আমার অন্যতম অর্জন ।বর্তমানে বাংলাদেশের বান্দারবান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পারন করছি ।

আমেরিকা ও কানাডা বসে আধুনিক প্রযুক্তি আইফোন,মেসেনজার, হোযাটসআপ, ইমেইল ব্যবহার করে শিক্ষক ও ছাত্র মিলে স্মৃতিময় দিনগুলি তৈরি করা হয়েছে ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 doorbin24.Com