Notice :
Welcome To Our Website...
কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান

কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান

আবুল মোমেন

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। তাঁর জন্ম এই দিনে ১৯২০ সনে। সে হিসেবে ২০২০ সনে তাঁর জন্মশতবর্ষ। একজন মানুষকে বিশেষভাবে স্মরণ করবার উপযুক্ত উপলক্ষ নিঃসন্দেহে। নিশ্চয় তাঁর জন্ম শতবর্ষ যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে। আমরা দু:খের সঙ্গে স্মরণ করি ১৯৯৫ সনে তাঁর ৭৫তম জন্ম জয়ন্তী উপযুক্ত গুরুত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি। তখন অবশ্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত সরকার। তবে ঢাকায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বড় ধরনের আয়োজনে উপলক্ষটি পালিত হয়েছিল। তাছাড়া কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীগণ যথাযথ মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের জন্যে দেশবাসীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাতে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় নি। এখন অবশ্য পরিস্থিতি বদলেছে, মানুষের চেতনা মুক্তিযুদ্ধের অনুক‚ল রয়েছে বলে মনে হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭৫ বছরের জন্মজয়ন্তী এসেছিল তাঁর মৃত্যুর দুই দশক পরে অর্থাৎ মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনের ইতি ঘটেছে। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে সে খবর দেশবাসী জানেন, সবাই এও জানেন যে তখন তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত  অন্তত ’৬৬-র ছয়দফা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই ছয় বছরে তিনি কেবল শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হন নি, তিনি বাঙালিকে জাতীয় চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা ও সাহস দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়েছে তাঁর মত সাহসী দৃঢ়চেতা নেতা ছিলেন বলে, হানাদার পাক বাহিনীর নৃশংস আক্রমণের মুখেও পিছু না হটে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল বলে, ভারত ও সোভিয়েত সহায়তা এসেছে বঙ্গবন্ধুর মত নেতৃত্ব ছিল বলে, স্বাধীনতা এত দ্রুত হওয়া এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পিছনেও ছিল বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা। আবার মিত্র বাহিনীর অংশ হিসেবে ভারতীয় বাহিনী যে বিজয়ের তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহৃত হয়েছিল তার পেছনেও বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায় কাজ করেছিল। ফলে স্বাধীনতার স্থপতি তিনিই, আধুনিক বাঙালির জাতীয় নায়ক তিনিই।
তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৭৫-৯৫ দুই দশক যারা দেশ শাসন করেছে তারা একই কায়দায় বঙ্গবন্ধুর নাম জাতীয় সমপ্রচার কেন্দ্রসমূহে প্রচার নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। প্রথম পর্যায়ে চলেছে তাঁর চরিত্র হনন ও ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনের চেষ্টা, আর বরাবর চলে এসেছে তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা প্রদর্শন। ২০০৬ সন পর্যন্ত যারা শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছে তারা কিভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম শোনে নি, তাঁর শতবর্ষে যে কিশোরের বয়স হবে ১৫ সে বড়জোর তাঁর নাম শুনবে, কিন্তু কিছুই জানবে না তাঁর সম্পর্কে কারণ না তার স্কুল পাঠ্য বইতে না রেডিও-টিভিতে সে তাঁর কথা জানার সুযোগ পেয়েছে। যে তরুণের বয়স এখন ৩০ সে তাঁর সম্পর্কে দু ধরনের বিপরীতমুখী কথাবার্তা শুনে আসছে, বলাবাহুল্য এতে নিন্দা ও সমালোচনার ভাগ কম হয়। অতএব তাঁর সম্পর্কে তার থাকতে পারে মিশ্র অনুভূতি। জনগণের মধ্যে এখনো আমরা তাঁর অন্ধ ভক্ত, নয়ত অন্ধ সমালোচক, কিংবা তাঁর বিষয়ে চরম উদাসীন মানুষের দেখা পাই। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনীতি, পটভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেকের স্মৃতিতেই আজ ঝাপসা, এ সংক্রান্ত বিতর্ক ও সমালোচনার স্মৃতি বরং অনেকটা প্রখর।
ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের এক চরিত্রে পরিণত হতে চলেছেন। কেবল গৎ বাঁধা নিয়মে জন্ম বা মৃত্যু দিবসে তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ পৌনপুনিকভাবে বাজানো, গৎ বাঁধা ভাবাবেগ মিশ্রিত মেঠো বক্তৃতার সেমিনার বা কাঙালি ভোজনের মাধ্যমে বিস্মৃতিকে ত্বরান্বিত করা যায়, স্মৃতি সংরক্ষণ সম্ভব হয় না। এ কথা মানতেই হবে যে ১৯৭৫-৯৫ এবং ২০০১-০৬ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সরকারি প্রচার মাধ্যমে উপেক্ষিত থাকায় একাধিক প্রজন্মের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয়ের অবকাশ ঘটে নি বঙ্গবন্ধুর। আর বিপরীত ধারার যে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে প্রতিপক্ষ করে দাঁড় করানো হয়েছে তার সমালোচনার অন্যতম লক্ষ্যস্থল তো ছিলেন তিনিই। ফলে তারুণ্য নির্ভর এই জাতির বড় একটি অংশের কাছে তাঁকে বিতর্কিত করে তোলা ও রাখার অপচেষ্টা কিছুটা হলেও ফল দিয়েছে।
একজন শাসককে তাঁর শাসনকালের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার ভিত্তিতে প্রশংসা-নিন্দা করা যায়, কিন্তু এসবের পেছনের কার্যকারণ, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুষঙ্গ-উপসর্গ তলিয়ে না দেখলে ঘটনা-দুর্ঘটনার প্রকৃত কার্যকারণ জানা যায় না। বস্তুতপক্ষে একজন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। বঙ্গবন্ধুও নন। কিন্তু তাঁর আমলে বড় বড় যেসব ঘটনা বারবার সমালোচনা হিসেবে আলোচনায় আসে, যেমন ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা পরবর্তী লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা, ’৭৫-এ বাকশাল গঠন ইত্যাদি কেবল তো প্রশাসকের দক্ষতা-অদক্ষতা বা সাফল্য ব্যর্থতার বিষয় নয়। এসবের পেছনে ষড়যন্ত্র আছে, বাস্তবতাকে সামলানোর কৌশলী পদক্ষেপ রয়েছে, দেশিবিদেশি কুশীলবদের যে ভ‚মিকা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ বিবেচনায় না নিলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে না, ঘটনারও যথাযথ ব্যাখ্যা মিলবে না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু তো শুধুমাত্র ’১৯৭২-’৭৫-এর নেতা নন। সেটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একমাত্র কালও নয়। কীভাবে ’৪৮ সন থেকে একজন স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক মানুষ ধীরে ধীরে পরিণত রাজনীতিক ও ত্যাগী দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন সে ইতিহাস কি কর্পুরের মত উবে যেতে পারে? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল ঠিক, কিন্তু তারপরও ছয়দফার আন্দোলন চালিয়ে প্রায় এককভাবে এই মানুষটি সারা বাংলাদেশে জাগরণী বাণী ছড়িয়ে না গেলে বাঙালি তার ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে রূপ দিতে পারত না। হয় মার্শাল ’ল নয়তো মাস্তানতন্ত্রের মাধ্যমে দেশ ও দেশবাসীকে কব্জা করে রাখা সম্ভব হত। ১৯৫৪ ও ’৫৬ -র নির্বাচন কী সহজেই না বানচাল করা গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৬ থেকে বঙ্গবন্ধু জেলজুলুম মামলা এবং সর্বশেষ ফাঁসির আসামি হয়েও না থেমে অকুতোভয় তেজে স্বাধিকারের অঙ্গীকারে অনড় থেকে সমগ্র জনগণের মনের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।
মানুষ সেই নেতাকে তার পূর্ণ আস্থা ও হৃদয়ের শ্রদ্ধা দিতে পারে যাঁর সম্পর্কে সে নিশ্চিত হতে পারে যে ইনি তার জন্যে জেল-জুলুম সইবেন, অত্যাচার সহ্য করবেন, এমনকি ফাঁসিতে গিয়ে নিজের জীবনও দিতে পারেন। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যে সাহস, ধৈর্য, মনোবল ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করেছেন এবং শত অত্যাচার ও ভীতির মুখেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়েন নি তাতেই আপামর জনসাধারণের যুগপৎ আস্থা ও শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করেন।
এমন নেতা বাঙালির জীবনে আর আসে নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেতাজী সুভাষ বসুর মধ্যে সেই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা ও অকালমৃত্যু চিত্তরঞ্জন দাশকে তাঁর সম্ভাবনার মুকুল ফোটাতে দেয় নি, আর দেশত্যাগ ও রহস্যজনক অকালমৃত্যু, সুভাষ বসুরও পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হতে দেয় নি। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক বড় মাপের জননেতা হলেও তিনি গণতান্ত্রিক ধারায় শাসকের তৈরি নিয়মের ভিতরে থেকেই রাজনীতি করেছেন। ঠিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বলতে যা বোঝায় তা ছিলেন না, তিনি ইংরেজ বা পাকিস্তান কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে বিরোধের রাজনীতি করেন নি। সোহরাওয়ার্দী মেধাবী রাজনীতিক হলেও ভাষা ও কৃষ্টিগত দূরত্বের কারণে ঠিক আম বাঙালির জননেতা হতে পারেন নি। বঙ্গবন্ধু বাঙালির সার্থক জননেতা, দেশনেতা, জাতীয় নেতা এবং স্বাধীনতার স্থপতি।
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, আজকের দিনে শততম জন্মবার্ষিকী, নিঃশব্দে কিংবা দায়সারা গোছের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেন কেটে না যায়। অতীতে এমন বিস্মৃতি বাঙালির জীবনে বারবার ঘটেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালির জীবনে শুধু এটুকুতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না’। তিনি শুধু চেয়েছেন এদেশের মানুষকে মুক্ত করতে, অর্থাৎ স্বাধীনতা দিতে। সেটি তিনি দিয়েছেন নিজের জীবনের সুখস্বাচ্ছান্দ্যের দিকে না চেয়ে, নিজের জন্যে কিছু প্রত্যাশা না করে।
স্বাধীনতার স্থপতিকে কেবল প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি রূপে দেখতে চাওয়ার মধ্যে একটা বিকৃত মানসিকতা আছে, ’৬৬ থেকে মার্চ ’৭১ পর্যন্ত এক মহৎ উত্থানকে অগ্রাহ্য করার মধ্যেও সেই একই বিকৃতিরই প্রকাশ ঘটে। এই বিকৃত মানসিকতা না কাটলে, সত্যকে সাদা চোখে দেখার মন তৈরি না হলে, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর যোগ্য মূল্যায়ন না হলে সম্ভবত বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। সপরিবারে তাঁর হত্যাকান্ড যেমন ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে তাঁর বিশাল অবদান অস্বীকারের মত এত বড় অন্যায় কোনো সমাজ দীর্ঘদিন স্থিরভাবে মেনে নিতে পারে না। গায়ের জোরে সামরিক স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের ইতিহাস বিকৃতির দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সনে সরকার গঠনের পরে। সেই থেকে সঠিক পথে জাতির যাত্রা নিশ্চিত হয়েছে। আশা করি এ জাতি আর ভুল পথে যাবে না।
সংস্কৃতে কবি শব্দের অর্থ হল সত্যদ্রষ্টা। কবি ও মনীষী অন্নদাশংকর রায় বঙ্গবন্ধুর যে মূল্যায়ন করেছেন তা-ই সত্যদ্রষ্টার মূল্যায়ন হিসেবে একদিন স্বীকৃত হবে।
যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গোরি যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
সেটি কোন কীর্তি? অবশ্যই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশর অভ্যুদয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.




© All rights reserved © 2017 doorbin24.Com